অলটারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) সহনেতা অ্যালিস ভাইডেল। হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫। ছবি: রয়টার্স
জার্মানির রাজনৈতিক দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) সহনেতা অ্যালিস ভাইডেল বিভিন্ন কারণে ব্যতিক্রমী ব্যক্তি। একদিকে, তাঁর উগ্র ডানপন্থী দলে পুরুষের আধিপত্য দেখা যায়। অন্যদিকে, অভিবাসনবিরোধী দলটি নিজেকে প্রথাগত পারিবারিক মূল্যবোধ ও সাধারণ মানুষের রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরে। তবে ভাইডেলের সাথে এসব বিষয় আপাতদৃষ্টিতে সাংঘর্ষিক।
৪৬ বছর বয়সী ভাইডেলের জীবনসঙ্গী শ্রীলঙ্কায় জন্মগ্রহণকারী এক নারী, এবং তারা দত্তক নেওয়া দুই সন্তানকে একসঙ্গে লালন-পালন করছেন।
ভাইডেল চলচ্চিত্রকার হিসেবেও পরিচিত। তিনি চীনে অর্থনীতি নিয়ে পিএইচডি করেছেন এবং ইংরেজি ও মান্দারিন ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন।
ভাইডেলের জন্ম পশ্চিম জার্মানিতে। তবে তাঁর নেতৃত্বাধীন এএফডি সাবেক পূর্ব জার্মানিতে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়, যা সাবেক কমিউনিস্ট জার্মানি হিসেবেও পরিচিত। রাজনীতি শুরুর আগে ভাইডেল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস ও জার্মানির অ্যালিয়ানজ গ্লোবাল ইনভেস্টরসে চাকরি করেছেন এবং কিছুদিন ফ্রিল্যান্স বাণিজ্য পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেছেন।
ব্যতিক্রমী কর্মজীবনের কারণে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ভাইডেল এএফডির জন্য একটি ‘সম্পদ’। তাঁদের মতে, জার্মানির কর্তৃপক্ষগুলো এএফডিকে গণতন্ত্রবিরোধী মনে করে, তবে ভাইডেলের উদার মনোভাবের কারণে দলটি সমাজের বহু মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছে।
ভাইডেলকে প্রায়ই কালো স্যুট, সাদা শার্ট এবং মুক্তার মালা পরতে দেখা যায়। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি অনেক বিষয়ের ক্ষেত্রে নিজের কিছু সহকর্মীর চেয়ে বেশি দক্ষ। তবে সমালোচকেরা তাঁকে ভয়ানক সুবিধাবাদী ও ‘ভালো মানুষের মুখোশধারী’ বলে মনে করেন।
এএফডি ১২ বছর আগে যাত্রা শুরু করে এবং জার্মানির আজকের নির্বাচনে ভাল অবস্থানে রয়েছে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে দলটি জার্মানির রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিতে পারে, এমনকি এ আশঙ্কাও রয়েছে যে দলটি ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির শাসনব্যবস্থাকে জটিল করে তুলতে পারে।
জার্মানির বোখুম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অলিভার লেম্বক বলেন, ‘ভাইডেল এমন ব্যক্তি, যিনি এএফডির প্রথাগত রাজনৈতিক এলাকার বাইরে বৃহত্তর জনগণের কাছে আবেদন তৈরি করতে পারেন। [দলটির] উন্মাদ ও চরমপন্থীদের আখড়ায় শুধু তাঁকেই পরিপক্ব বলে মনে হয়।’
ভাইডেলের নেতৃত্বে গত কয়েক বছরে এএফডির সমর্থক বেড়েছে। এ সময় মূলত অভিবাসনবিরোধী মনোভাব ও চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজের ভঙ্গুর জোটের কার্যক্রমে সৃষ্ট হতাশা থেকে দলটি লাভবান হয়েছে। শলৎজের নেতৃত্বাধীন জোট গত নভেম্বরে ভেঙে গেছে।
জার্মানিতে সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারে বেশ কিছু সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যা ভাইডেলের মন্তব্যে ক্ষোভ উসকে দিয়েছে। সহিংসতার ঘটনায় একাধিক অভিবাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আজকের নির্বাচনের জরিপ অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ২৯ শতাংশ সমর্থন রয়েছে রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ)। ২১ শতাংশ নিয়ে পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে এএফডি। ১৬ শতাংশ নিয়ে তৃতীয় স্থানে শলৎজের নেতৃত্বাধীন সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এসপিডি)।
এএফডি আগে কখনো চ্যান্সেলর প্রার্থী দেয়নি, এবং ভাইডেল ইতোমধ্যে স্বীকার করেছেন যে এখন তাঁর দলের সরকারের শরিক হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এই মন্তব্যের কারণে অন্যান্য দলগুলো এএফডির সঙ্গে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, ফলে এএফডিকে ঘিরে একধরনের সহযোগিতা না করার মনোভাব গড়ে উঠেছে।
এসপিডি প্রধান ওলাফ শলৎজের (বাঁয়ে) নির্বাচনী প্রচারণার পোস্টার ও এএফডি প্রধান অ্যালিস ভাইডেলের নির্বাচনী প্রচারণার পোস্টার। জার্মানির হামবুর্গে, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫। ছবি: রয়টার্স
তবে এ মনোভাব চুরমার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রক্ষণশীল সিডিইউর প্রধান ফ্রিডরিখ মের্জ গত মাসে এএফডির সঙ্গে সরাসরি কাজ না করার প্রথা ভেঙে দিয়েছেন। তিনি পার্লামেন্টে অভিবাসনবিরোধী একটি বিল পাসের জন্য সরাসরি দলটির সমর্থন নিয়েছেন। তবে এএফডির সঙ্গে শরিক সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।
আজকের নির্বাচনের মাধ্যমে এএফডিকে ঘিরে গড়ে ওঠা ভিন্নধর্মী মনোভাব ভেঙে যাবে বলে মনে করেন ভাইডেল। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, শুধু এএফডির সমর্থন নিয়েই রক্ষণশীলরা সত্যিকার পরিবর্তন বাস্তবায়ন করতে পারেন।
রাজনৈতিক উত্থান
ভাইডেল তাঁর বেড়ে ওঠাকে ‘ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক’ বলে বর্ণনা করেছেন, যদিও তাঁর মা-বাবার কেউ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
তিনি তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট। স্কুলে তিনি অত্যন্ত তর্কপ্রিয় ছিলেন বলে জানান। পশ্চিম জার্মানিতে সরকারি সামাজিক আবাসনে বসবাসকারী মধ্যপ্রাচ্যের অভিবাসীদের সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না বলে জানিয়েছেন।
সুইজারল্যান্ডের ম্যাগাজিন ভেল্টভোখে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভাইডেল বলেন, ‘মানুষ আপনাকে সব সময় “বাজে মেয়ে” বা এ ধরনের কোনো শব্দ দিয়ে সম্বোধন করলে আপনি তো বাইরে যাওয়ার আনন্দ উপভোগ করবেন না।’
বাণিজ্য ও অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করার পর ভাইডেল গোল্ডম্যান স্যাকসে চাকরি শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি চীনে চলে যান, যেখানে দেশটির পেনশনব্যবস্থা নিয়ে পিএইচডি করেন এবং বাণিজ্য পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেন।
ভাইডেল ২০১৩ সালে এএফডিতে যোগ দেন, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সংকট নিয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচির (বেইল আউট) বিরোধিতা করায় দলের প্রতি আকৃষ্ট হন। তবে তখনো দলটি এতটা অভিবাসনবিরোধী ছিল না।
অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনার জায়গা থেকে ভাইডেল উদারপন্থী। তিনি প্রয়াত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারকে নিজের আদর্শ মনে করেন এবং তাঁর আশা, ইইউ যদি নিজেদের যথেষ্ট সংস্কার করতে না পারে, তবে যুক্তরাজ্যের মতো গণভোট দিয়ে জার্মানিরও ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়া উচিত।
ভাইডেল জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সন্দেহপ্রবণ এবং করহার নিম্ন রাখার পক্ষে। একই সঙ্গে তিনি ন্যূনতম মজুরির অবসান চান এবং রাষ্ট্রকে ছিমছাম রাখতে আগ্রহী। ব্যয়বহুল হওয়ায় অর্থনীতিকে কার্বন-নিরপেক্ষ হিসেবে রূপান্তরিত করার বিরোধিতা করেন।
বহুমুখী দক্ষতার অধিকারী এই রাজনীতিবিদ অভিবাসন নীতি আরও কড়াকড়ি করার পক্ষে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী আসায়, এ বিষয়ে জার্মানিতে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে এবং তিনি এটাকে কাজে লাগিয়েছেন।
‘বহুমুখী গুণ’
ড্রেসডেন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যান্স ভরল্যায়েন্ডার মনে করেন, ভাইডেলের শক্তি তাঁর ‘বহুমুখী গুণে’ নিহিত। তাঁর মতে, সংবাদমাধ্যমের কাছে ভাইডেল একজন ‘সহনশীল, সদাচারী বুর্জোয়া রাজনীতিবিদ’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ অন্যান্য জায়গায় চরমপন্থী দর্শকদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, তা-ও তিনি ভালোভাবে জানেন।
নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তাঁর দলেও কিছু বিভেদ রয়েছে, কারণ তাঁর দল সমকামী বিবাহের বিরুদ্ধে।
একটি টিভি বিতর্কে অ্যালিস ভাইডেল। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫। ছবি: রয়টার্স
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অলিভার লেম্বকের মতে, ভাইডেল তাঁর পরিচয় নিয়ে অত বেশি মাথা ঘামান না। তাঁকে সমকামী বলা হোক, এটাও তিনি চান না। তবে অবস্থান ধরে রাখতে দলের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল তিনি ভালোভাবে রপ্ত করেছেন। তাই তিনি দলের চরমপন্থী অংশগুলোর লাগাম টানার পরিবর্তে সেগুলো সহ্য করছেন।
জার্মানিতে ২০১৭ সালে সমলিঙ্গের বিয়ে আইন করে বৈধ করা হয়। তখন তিনি অভিবাসনের বিষয়টি বাদ দিয়ে এটি নিয়ে কথা বলাকে অগুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছিলেন।
Leave a Reply